যোগেন চৌধুরীর ছবির সামনে দাঁড়ালে প্রথম যে জিনিসটা আপনার চোখে লাগবে, সেটা রেখা। একটা রেখা। একটানা। কাঁপতে কাঁপতে চলেছে। কোথাও থামছে না। যেন একটা মানুষ হাঁটছে, হোঁচট খাচ্ছে, আবার হাঁটছে। এই রেখাটা সোজা না। এই রেখাটা সুন্দর হওয়ার জন্য আঁকা না। এই রেখাটা সত্যি হওয়ার জন্য আঁকা।
আমরা ছোটবেলায় শিখি, রেখা মানে বাউন্ডারি। এটা ভেতর, ওটা বাইরে। যোগেন চৌধুরী এসে বলেন, না। রেখা মানে বাউন্ডারি না। রেখা মানে ইতিহাস। একটা মানুষের মুখে যে ভাঁজ পড়ে, সেটা তো শুধু চামড়ার ভাঁজ নয়। সেটা একটা দেশভাগের ভাঁজ। সেটা একটা উদ্বাস্তু কলোনির ভাঁজ। সেটা না-খেতে পাওয়া দুপুরের ভাঁজ।
তো এই রেখাটা কোথা থেকে আসলো? ডহরপাড়া থেকে।
১৯৩৯ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি। ব্রিটিশ ইন্ডিয়া। গোপালগঞ্জের এক গ্রাম। ডহরপাড়া। নামটা খেয়াল করেন। ডহর মানে শুধু রাস্তা না, ডহর মানে বড় জলাশয়ও। যেখানে জল থমকে থাকে।
ওই গ্রামে এক জমিদার বাড়ি। ফরিদপুরের জমিদার প্রমথনাথ চৌধুরী। আড়াই হাজার বিঘা জমির মালিক। কিন্তু লোকটা জমিদারি কাগজের উল্টো পিঠে ছবি আঁকে। মূর্তি গড়ে। এইটা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আমাদের এখানে জমিদার মানে শোষক। কিন্তু এই জমিদার ছবি আঁকে। মানে তার ভেতরেও একটা দ্বন্দ্ব আছে। ক্ষমতা আর শিল্প কখনোই একসাথে থাকতে পারে না, কিন্তু ওই বাড়িতে সেটা ছিল।
আর মা। মা আলপনা দেন। আলপনা মানে কী? আলপনা মানে অস্থায়ী শিল্প। সকালে আঁকবেন, বিকেলে মুছে যাবে। পা পড়ে মুছে যাবে। এই অস্থায়ীত্ব যোগেনের মাথায় ঢুকে গেছিল ছোটবেলাতেই। শিল্প যে মিউজিয়ামে থাকার জন্য না, শিল্প যে রোজ মুছে যাওয়ার জন্য – এইটা তিনি মায়ের কাছ থেকে শিখেছিলেন।
তো বাবার জমিদারি কাগজের পেছনে তিনি আঁকিবুঁকি করতেন। ভাবেন দৃশ্যটা। সামনে জমিদারির হিসাব। খাজনা। প্রজা। আর পেছনে একটা বাচ্চা ছেলে একটা ময়ূর আঁকছে। দেয়ালে। সেটাই তার জীবনের প্রথম ছবি। ময়ূর। যে পাখি সুন্দর, কিন্তু তার পা কুৎসিত। যোগেন সারাজীবন এই কুৎসিত পা-টাই এঁকেছেন।
যখন কুমোর আসতো দুর্গা বানাতে। তিনি দেখতেন। খড়, তুষ, মাটি – কীভাবে আঙুল হয়ে যাচ্ছে, কীভাবে চোখ হচ্ছে। এই দেখা, এই তাকিয়ে থাকা–এইটা স্কুলে শেখায় না। এইটা গ্রাম শেখায়। শিল্প যে রেডিমেড না, শিল্প যে বানাতে হয়, মাটি থেকে, খড় থেকে – এইটা তিনি তখনই বুঝেছিলেন।
১৯৪৭। একটা রেখা টানা হলো মানচিত্রে। র্যাডক্লিফ লাইন। ওই একটা রেখা যোগেনের জীবনের সব রেখা বদলে দিল।
১৯৫০ সালে পরিবার কলকাতায়। শহীদনগর কলোনি, ঢাকুরিয়া। কলোনি মানে কী? কলোনি মানে যাদের দেশ নাই, তাদের ঘর। টিনের চাল, এক চিলতে উঠোন, অনেক মানুষ। ওইখানে তিনি দেখলেন মানুষের শরীর কীভাবে বদলায়। উদ্বাস্তু নারীর শরীর। তার স্তন ঝুলে গেছে। তার চোখ গর্তে ঢুকে গেছে। তার শাড়ি ছেঁড়া।
তিনি আঁকতে শুরু করলেন।
এইখানে তার ক্রস-হ্যাচিং এর জন্ম। ছোট ছোট আঁচড়। একটার উপর আরেকটা। বলিরেখা বোঝানোর জন্য। এটা সহজ কোনো টেকনিক না, এটা একটা দর্শন। একটা মানুষের উপর আরেকটা মানুষের ইতিহাস কীভাবে চাপা পড়ে, একটা ক্ষতের উপর আরেকটা ক্ষত কীভাবে জমে – ওই হ্যাচিং সেইটা।
কলকাতা আর্ট কলেজ। ১৯৫৫-১৯৬০। শিক্ষকরা – মানিকলাল বন্দ্যোপাধ্যায়, গোপাল ঘোষ, হরেন দাস। তারা তাকে শেখালেন কীভাবে আঁকতে হয়। কিন্তু তিনি শিখলেন কীভাবে না-আঁকতে হয়। কারণ একাডেমিক আঁকা মানেই সুন্দর আঁকা। আর তিনি সুন্দর আঁকতে চাননি। তিনি সারাজীবন একটা সত্য আঁকতে চেয়েছিলেন।
বড় ভাই বামপন্থী আন্দোলন করতেন। তার হাত ধরে তিনি বামপন্থী সাহিত্য, শিল্পীদের লেখা পড়লেন। মানব মুক্তি – শব্দটা বড়, কিন্তু তিনি বিশ্বাস করলেন। তার ছবিতে অন্ধকার ঢুকে গেলো। যন্ত্রণা ঢুকে গেলো।

১৯৬৫। ফরাসি সরকারের স্কলারশিপ। প্যারিস। একোল দে বো-জা। উইলিয়াম হেটারের আতেলিয়ের ১৭।
আমরা ভাবি প্যারিস মানে মুক্তি। কিন্তু যোগেনের জন্য প্যারিস মানে কনফ্রন্টেশন। তিনি ওখানে পিকাসো দেখলেন। মাতিস দেখলেন। ইউরোপীয় ফিগার দেখলেন। কিন্তু তিনি বুঝলেন, ওই শরীর তার শরীর না। ওই নারী তার মা না। ওই পুরুষও তার বাবা না।
তিন বছর তিনি ঘুরলেন। ফ্রান্স, ইতালি, জার্মানি, নেদারল্যান্ডস, মিশর। মিউজিয়াম – গ্যালারি। তিনি কী দেখলেন? তিনি দেখলেন ইউরোপ শরীরকে কীভাবে দেখে। আর তিনি ভাবলেন, আমি আমার শরীরকে কীভাবে দেখি?
এইখানেই তার ব্রেকথ্রু। তিনি ইউরোপ থেকে টেকনিক নিলেন, কিন্তু গল্প নিলেন না। তিনি ফিরলেন। ১৯৬৮। অনেকে প্যারিস গিয়ে প্যারিস হয়ে যায়। যোগেন প্যারিস গিয়ে আরও বেশি ডহরপাড়া হয়ে ফিরলেন।
যোগেন চৌধুরীর ছবিতে শরীর সুন্দর না। শরীর লাবণ্যময় না। শরীর ভারী। শরীর ঝুলে পড়া। চোখ বড়। ঠোঁট মোটা। আঙুল লম্বা, অস্বাভাবিক লম্বা। কেন? কারণ তিনি বাঙালি শরীর এঁকেছেন। যে শরীর রোদে পোড়ে। যে শরীর না খেয়ে থাকে। যে শরীর ভয়ে থাকে। যে শরীর প্রেম করতে গিয়েও ভয় পায়।
তার নারী – খেয়াল করেন – তার নারী কখনো পিন-আপ না। তার নারী মা, তার নারী বোন, তার নারী উদ্বাস্তু কলোনির সেই মহিলা যিনি দুপুরে বাচ্চাকে ঘুম পাড়াচ্ছেন। তার স্তন ঝুলে আছে, কারণ সেই স্তন বাচ্চাকে খাইয়েছে। তার পেটে ভাঁজ, কারণ সেই পেট বাচ্চা ধরেছে। এইটা রাজনীতি। শরীরকে সুন্দর না দেখানোও একটা রাজনীতি।
আর পুরুষ – ভীরু, কামুক, ক্লান্ত। বাবু। টাই পরা বাবু, কিন্তু চোখে লোভ। ক্ষমতাবান পুরুষ, কিন্তু ভেতরে ফাঁপা। তিনি ব্যঙ্গ করেছেন। সমাজ আর রাজনীতির কদর্য রূপকে তিনি কার্টুনের মতো করে এঁকেছেন, কিন্তু কার্টুন না। কারণ কার্টুন হাসায়, তার ছবি হাসায় না, অস্বস্তি দেয়। এই অস্বস্তিটাই যোগেনের বড়ো শক্তি।
তিনি সব মাধ্যমে কাজ করেছেন। কিন্তু তার আসল প্রেম কালি আর প্যাস্টেল। কালি – কারণ কালি ফেরত নেয়া যায় না। একবার টান দিলে শেষ। জীবনের মতো। ভুল করলে মুছতে পারবেন না। ওই অনিশ্চয়তা তিনি ভালোবাসতেন। প্যাস্টেল – কারণ প্যাস্টেল নরম। আঙুল দিয়ে ঘষতে হয়। শরীরের সাথে শরীরের ঘষা। প্যাস্টেলের যে ধুলো, সেটা শরীরের ধুলোর মতো।
তিনি বলতেন, আমি সমাজ সচেতন শিল্পী। এই কথাটা আজকাল সবাই বলে, কিন্তু তিনি সত্যি ছিলেন। কারণ তিনি শুধু ছবি আঁকেননি, তিনি প্রতিষ্ঠান বানিয়েছেন। শান্তিনিকেতনে পড়িয়েছেন। রাষ্ট্রপতি ভবনের কিউরেটর ছিলেন। তরুণ শিল্পীদের জন্য জায়গা বানিয়েছেন।
পরে তৃণমূল কংগ্রেসের হয়ে রাজ্যসভায় গেছেন। অনেকে সমালোচনা করেছে। শিল্পী কেন রাজনীতিতে যাবে? কিন্তু তিনি মনে করতেন, শিল্প যদি মানুষের কথা বলে, তাহলে মানুষের পার্লামেন্টেও তার কথা বলা উচিৎ।
আজ ২৫ অক্টোবর ২০২৬, তিনি চলে গেলেন। ৮৭ বছর বয়স। ব্লাড ক্যানসার, ইউরিন ইনফেকশন – শরীর আর পারলো না। খবরটা শুনে মনে হলো, একটা রেখা থেমে গেল। যে রেখাটা ১৯৩৯ সালে ডহরপাড়ার এক জমিদার বাড়ির কাগজের পেছনে শুরু হয়েছিল, সেটা আজ থামলো। কিন্তু থামলো কি? না। কারণ রেখা থামে না। রেখা থেকে যায়। আপনি আজও কলকাতার কোনো গ্যালারিতে তার ছবির সামনে দাঁড়ালে দেখবেন, সেই কাঁপা কাঁপা রেখাটা এখনো কাঁপছে। আপনার দিকে তাকিয়ে। আপনাকে জিজ্ঞেস করছে – তুমি কে? তোমার ভাঁজগুলো কোথা থেকে আসলো?
এই সময়ে, যখন সবাই ফিল্টার দিয়ে ছবি সুন্দর করে, যখন এআই দিয়ে পারফেক্ট মুখ বানায়, তখন যোগেন চৌধুরীকে দরকার। কারণ তিনি বলেন, পারফেক্ট মুখ সত্যি না। কুঁচকানো মুখ সত্যি। ঝুলে পড়া চোখ সত্যি।
কারণ তিনি বলেন, শিল্প মানে সুন্দর বানানো না, শিল্প মানে চেনা। নিজেকে চেনা। নিজের দেশকে চেনা। নিজের মাকে চেনা। কেননা, ভাষা মানে শুধু শব্দ না, ভাষা মানে শব্দের মাঝখানের ফাঁকা জায়গা। যোগেন চৌধুরীর রেখাও তাই। রেখা মানে শুধু কালি না, রেখা মানে দুটো রেখার মাঝখানের ফাঁকা জায়গা। ওই ফাঁকা জায়গায় মানুষ থাকে। ওই মানুষটাকে তিনি এঁকেছেন সারাজীবন। এবং ওই মানুষটাই আমরা।
যোগেন চৌধুরীর কিছু চিত্রকর্ম





















































































































































































































































































1 Comment. Leave new
কী দারুণ গদ্য!
শিল্পী যোগেন চৌধুরীর প্রয়াণে শ্রদ্ধা।