যদি কখনো আমাকে কেউ বলে, তোমার প্রথম প্রেমের স্মৃতি কী?–দ্বন্দ্ব লাগে। আসলে কি আমার কোনো প্রথম প্রেম ছিল? নারী কিংবা গাছের সঙ্গে, পাখি কিংবা কোনো অকূল নদীর সঙ্গে? এসব প্রশ্ন ভেতরে খেলতে থাকলে তখনই ভাবি, মনে হয় এতসব রূপে আমার মা-ই হতে পারে সেই প্রেম–যাকে আমি প্রথম ভালোবেসেছিলাম। কিন্তু না, ছোট থেকেই মা-কে তেমন কাছাকাছি পাইনি–তার গন্ধও না, চুলও না, চলনও না। তবে আমি কার বা কিসের প্রেমে প্রথম পড়েছিলাম?
এই দ্বন্দ্ব নতুন করে পয়দা করল কবি শৈবাল নূর। ফোন করে লিখতে বলল প্রথম প্রেম নিয়ে। বন্ধুদের মধ্যে জানাজানি আছে–আমার নারী-প্রেম। কিন্তু আমি যখন ভাবতে বসলাম, আমার প্রথম প্রেমটা কী–আমি যেন ঘুরে ঘুরে সেই একই স্থানে বসে পড়লাম। একটা পুকুরপাড়। পাশে পাখি, চারদিকে আমগাছ, পাতা সবুজ। ছোটবেলায় ভাবতাম–সবুজ পাতাই পৃথিবীর আব্বা-আম্মা। বড় হয়েও এই চিন্তা এখন আরও গাঢ় হয়েছে।
সবুজ চিন্তা থেকেই প্রেমের পথ খুলল। ছোট থেকেই নীরব ছিলাম, যদিও মনে পড়ে, একজন আমাকে ‘পথের পাঁচালি’ বলত – কেন বলত জানি না। পরে বড় হয়ে দেখলাম, এই নামে সিনেমা আছে। আমি ভাবতাম, আমি খুব প্যাঁচাল পারি, এজন্যই ‘পথের পাঁচালি’। যাক সে কথা। পুকুরে ফিরি।
সবুজ পুকুর–চারপাশ তার নেপিয়ার ঘাসে আচ্ছন্ন। সকাল, দুপুর কিংবা সন্ধ্যা-রাত – কৈশোরে আমার ভেতরে একটা পুকুর দাগ কেটেছিল। হ্যাঁ, পদ্মপুকুর। জল ভরলে, কিংবা ভরা বর্ষায়, সেই পুকুরে ফুটত লাল পদ্ম।
ফুলও তো আমার প্রিয়। হয়তো ফুল দেখতে মাঠ পেরিয়ে প্রথম সেখানে গিয়েছিলাম। কিন্তু না–এখন মনে পড়ে, আমি মূলত ছায়ার খোঁজে, পথ হাঁটতে হাঁটতে ক্লান্ত পথিকের মতো সেখানে বসেছিলাম। পাতার সুরে ঘুমিয়েছি, গান শুনেছি রশিদ সরকার আর আসিফ আকবরের। যদিও প্রথম দিকে আমার ফোন ছিল না। না থাকা নিয়েও ভাবলে এখন মনে পড়ে–ওই পুকুরপাড় শুধু আমারই প্রথম প্রেম ছিল না। আমরা যারা অন্যের ফোনে গান শুনতাম, তারাও দিনভর সেখানেই বসে থাকতাম। এখন বুঝি, হয়তো তাদেরও প্রথম প্রেম ছিল – কিংবা আমি যেভাবে ভাবি, সেভাবে হয়তো তারা ভাবেনি।
ওই পুকুর আমার সঙ্গে খেলত। বহুদিন, বহু ম্যাচে আমি খেলব বলে পুকুরপাড়ে বসে থেকেছি–খেলেওছি, কিন্তু বেশিরভাগ ম্যাচেই আমাকে নিত না ওরা। তবে… পুকুর আমাকে নিত। আমি বসতাম–খেলা হোক বা না হোক। আমি বসতাম একাকী, আমি বসতাম গানের জন্য। কেননা গ্রামীণ জীবনে গান আর পানই ছিল মূল নকশা। শৈশবে, কৈশোরে আমি অনেক গান গাইতাম। এখনো যে গাই না, তেমন না – গাই, তবে বেছে বেছে। এখন গাই সঞ্জীব আর কবিরের অমরত্ব। এখন তো জীবন বহু কংক্রিটে, বহু অনলে ছাই হয়ে গেছে।
এখন অনেক প্রেমের স্মৃতি উঁকি দেয়–অনেক প্রেম গোপনে কাঁদায়, হারায়, ভয় দেখায় দানবপাখির মতো। কিন্তু যাকে শৈশবে এঁকেছি, কৈশোরে কিংবা দূরে থেকে এখনো যখন ফোনের গ্যালারিতে তার ছবি দেখি, শান্তি লাগে। কিন্তু অন্য কোনো প্রেমের ছবি চোখে পড়লেই আতঙ্ক জাগে। এখানেই আমার কাছে প্রকৃত প্রেমের পার্থক্য
কিন্তু প্রেম কখনো থামে না। জয় গোস্বামী এক কবিতায় যেমন বলেছেন, ‘পাগলী, তোমার সঙ্গে ভয়াবহ জীবন কাটাব।’–এখন ভাবি, হয়তো কৈশোরে আমরা এমন পণ করেছিলাম। মনে পড়ে মায়ের মুখ। দুপুর গড়ালে, যদি না ফিরি ঘরে, যদি না ফিরি খেতে–দিব্যি সেই নারী পুকুরেই চলে আসত। হয়তো দেখত, আমি গাছের শরীরে আমার শরীর এক করে দিয়েছি। হয়তো সেই থেকেই আমার ভেতর কবিতার সুর বাসা বেঁধেছিল। তখনও শিখিনি–অভিমান, নাম, সর্বনাম কিংবা মনভাঙা, উচাটন।
একবার পুকুরের প্রেম অনুভব করেছিলাম ঢাকায় এসে। তখন সেভেন ক্লাসে পড়ি–পরিবার চলে এলো ঢাকা। স্কুল ছেড়ে, উঠোন ছেড়ে। কিন্তু পুকুর ছেড়ে আসা সম্ভব হয়নি। পরে যদিও আমরা ঢাকায় খুব বেশিদিন থাকতে পারিনি। রাজধানীতে এসে মনে হলো, আমার কোনো বন্ধু নেই। একটা নদী ছিল আমাদের বাসার ওদিকে–তুরাগ নাম তার। সেই নদীও আমার বন্ধু হতে পারেনি। একটা ছোট পুকুর একটা মস্ত নদীকে কীভাবে গিলে খেল–এখন ভাবতে গা কাঁপে। ভাবি, ওর দাঁত কোথায়? কোন গালেই বা খেল?
সেই পুকুর–প্রশস্ত তার বুক। দোলে ধান–সবুজেও, হলুদেও। আম সবুজ হলে ধানগাছও সবুজ, ধানগাছ হলুদ হলে আমও হলুদ। মনে হতো, পরস্পর ভাইবোন–একই ঋতুতে আসে, আবার যায়। একবার আমি তার ছবি এঁকেছিলাম–সেটা ঠিক ছবি নয়, শুধু গাছ আর গাছ। কেননা ধানের দিনে ধান, ঘাসের দিনে ঘাস, আর বারোমাস গাছের বাতাস। খুব ছোট থেকেই বন্ধুও কম–লাজুক স্বভাব বলে প্রাণ খুলে কথা বলিনি। এখনো কখনো কখনো সেই অভিজ্ঞতা উজাড় হয়ে বসে আমার ভেতর।
আমার তো মনে পড়ে–কত দুপুর একা একা–হাফপ্যান্ট পরে মিঠে সুরে উঠতাম গোসলে মেতে। আমার মা কোথা থেকে আসত, জানা নেই। তিনি এলেই উঠে যেতে হতো।
প্রেম শুনেছি স্মৃতি জাগানিয়া–গান শেখায়, আবার হারায়। এখন লিখতে বসে মনে হলো–তবে কি এই পুকুরই আমার প্রথম প্রেম? যে আমাকে গান শিখিয়েছে, যাকে হারিয়েছি, কিন্তু হারাইনি। একবিন্দু স্মৃতি এখনো মগজ থেকে মুছে যায়নি। সে যেন অদৃশ্য মেট্রোরেল–গাছ, পাতা, সুর, পাখি আর আমাদের বহুমাত্রিক কথাবার্তা নিয়ে কেবলই ঘুরপাক খাচ্ছে। গান গাইছে রশিদ সরকার–‘পাগল মরলে বাত্তি জ্বলে।’ কিংবা আসিফ আকবর বলছেন, ‘ও পাষাণী, বলে যাও কেন ভালোবাসনি।’
সুমন বলে, ‘অমরত্বের প্রত্যাশা নেই, নেই কোনো দাবিদাওয়া–এই নশ্বর জীবনের মানে শুধু তোমাকেই চাওয়া।’–এখন অমরত্ব কিংবা চাওয়া–কোনোটাই আর আমার সাজে না। প্রকৃত প্রেম আসলে চাওয়া বা না-চাওয়ার পরোয়া করে না – উদাহরণ: খোদা ও বান্দা। এখানেই বান্দা খোদাকে না চাইলেও শেষ পর্যন্ত তাকে খোদার কাছেই ফিরতে হয়। আবার একইভাবে, বান্দা ছাড়া খোদারও কোনো সত্তা নেই। মানে, প্রেম চাওয়ার বিষয় নয়–সে আপনাআপনি কোষে কোষে নৃত্য করে। যেমন পুকুরকে আমি কখনোই মুখে বলিনি, সে আমার হোক। অথচ সেই পুকুর আমারই, না চাইতেও, না চাইলেও।
এখন অনেক প্রেমের স্মৃতি উঁকি দেয়–অনেক প্রেম গোপনে কাঁদায়, হারায়, ভয় দেখায় দানবপাখির মতো। কিন্তু যাকে শৈশবে এঁকেছি, কৈশোরে কিংবা দূরে থেকে এখনো যখন ফোনের গ্যালারিতে তার ছবি দেখি, শান্তি লাগে। কিন্তু অন্য কোনো প্রেমের ছবি চোখে পড়লেই আতঙ্ক জাগে। এখানেই আমার কাছে প্রকৃত প্রেমের পার্থক্য–এখানেই মিলিয়ে যাওয়া, কথা বলা। এখানেই সে চুল খোলা নারীর মতো। এখানেই সে নতুন কবিতার প্রান্তর।






































































































































































































































































