৩০ অক্টোবর ২০২৬
অসুখের নাম
চিত্রবিন্যাস :
বিজন অরণ্য
সাম্য রাইয়ান
কবি, কথাসাহিত্যিক
10

সাম্য রাইয়ান
কবি, কথাসাহিত্যিক

10

অসুখের নাম

ক.

“এবার অসুখ হলে ব্রহ্মপুত্রে এসো।
পাতা ঝরা শহরে মানুষ ঝরে যাচ্ছে যেভাবে!
তোমাকে নিয়ে তাই নৈরাজ্যের ভয়।”
(আগন্তুক / মাহফুজ মালাকার)

সেপ্টেম্বরে ব্রহ্মপুত্রে গিয়েছিলাম। হাফ নিরুদ্দেশ। তীরে পৌঁছানোর দশ মিনিটের মাথায় পুরো আধঘণ্টা ধরে বৃষ্টি—ঝুম বৃষ্টি। একটা ভাঙা দোকানের বারান্দায় আমি, মাহফুজ ভাই, একটি ছাগল, একটি শিশু ও তার চাচা, অদূরে মোকলেছুর ভাই অন্য দোকানের বারান্দায়। দোকান বন্ধ। সামনে নদী, চারদিকে বৃষ্টি। ছাউনির টিনে প্রচুর শব্দ পেরিয়ে আমাদের গল্পে ঢুকে পড়ছিলেন বুকাওস্কি, মানিক, মার্কেস, বিভূতিভূষণ, হুমায়ূন…। আর শিপনের জন্য অপেক্ষা।

উৎকণ্ঠাহীন ছাগলটা একবার আমাদের দিকে, আরেকবার বৃষ্টির দিকে তাকাচ্ছিল। ভিজতে না চাওয়াটাই তার একমাত্র সমস্যা; আর কিছু নিয়ে চিন্তিত বলে মনে হলো না। বৃষ্টি থামলে ছাগলটাই আগে বের হলো। আমরা তার পরে; চা খুঁজতে বের হলাম। বৃষ্টিতে নদীর পাড়ে চায়ের দোকান বন্ধ থাকা অস্বাভাবিক নয়।

কিন্তু আমার মাথায় তখন চায়ের কথাই ঘুরছিল। কিছুটা সামনে এগিয়ে চায়ের দোকান পেলাম। তিনি আমাদের উদ্দেশ্য জানতে চাইলেন। ‘কার কাছে যাবেন’; আমাদের সময়ের এক বিরাট জিজ্ঞাসা। কোথায় যাব? কেন যাব? কতক্ষণ থাকব?

আসলে আমাদের কোথাও যাওয়ার কথা ছিল না। কিংবা যাওয়ার কথা ছিল বলেই হয়তো যাওয়া হচ্ছিল না। গন্তব্যের চেয়ে নদীতীরে দাঁড়িয়ে থাকাটাই জরুরি হয়ে উঠেছিল। তাই আমরা নদী দেখতে এসে অন্তর্লোকে জমে থাকা পলির পরিমাপ করছিলাম।

নদীর জলের মতো আমাদের অসুখও বদলে ফেলছে নিজের পরিচয়। আমরা শুধু তার নতুন নতুন নাম শিখছি।

খ.
ডাক্তারের চেম্বারে বসে একবার দেখেছিলাম, প্রেসক্রিপশন হাতে এক বৃদ্ধ তার ছেলেকে জিজ্ঞেস করছেন, এই ওষুধগুলো সব কিনতে হবে?
ছেলে বলল, স-ব।
বৃদ্ধ বললেন, সবগুলো কেনার টাকা হবে?
ছেলে বলল, দেখি।
তারপর নীরবতা।

বুঝলাম, দুনিয়ার সবচেয়ে কঠিন রোগের নাম দারিদ্র্য। কারণ তার কোনো ওষুধ নেই। একজন মানুষ যদি চিকিৎসার খরচ জোগাতে গিয়ে ধার করেন, সেই ধার যদি তার মেয়ের পড়াশোনা বন্ধ করে দেয়, মেয়েটি যদি পরে ঢাকায় গিয়ে গার্মেন্টসে কাজ করে এবং সেখানে তার মজুরি আটকে যায়, তখন সেই অসুখের কী নাম দেবেন?

যখন সহজ মানুষের যাপন অনিশ্চিত-দুর্বিষহ, একজনের বিপদ মানে দশজনের বিনোদন— তখন সে অসুখের চিকিৎসাই বা কার কাছে নেবেন?

অসুস্থ সমাজ সুস্থ থাকার দায় সবসময় ব্যক্তির ঘাড়েই চাপিয়ে দেয়। একদিকে আমরা প্রতিদিন নিজেকে বাঁচানোর কৌশল শিখি, অপরদিকে বেঁচে থাকার শর্তগুলোই ক্রমশ নাগালের বাইরে চলে যায়।

গ.
বুদ্ধিমানের বড় সমস্যা হলো বিপদটা আগে থেকে দেখতে পায়। ফলে বিপদে পড়ার আগেই বিপদের অর্ধেক ভোগ করে ফেলে।

ধরুন, সকালে খবরের কাগজ হাতে ভাত খেতে বসেছেন। সেখানে যুদ্ধ, ধর্ষণ, দুর্নীতি, মূল্যবৃদ্ধি, হত্যা, নির্বাচন, ভূমিকম্প। আপনি এক লোকমা ভাত মুখে দিলেন, আর পৃথিবীর অন্য প্রান্তে কেউ মারা গেল। দ্বিতীয় লোকমা মুখে দিলেন, কোনো মন্ত্রী দুর্নীতির অভিযোগ অস্বীকার করলেন। তৃতীয় লোকমায় ক্রিকেটার শতরান করলেন। একের পর এক, এরপর আর এক… ভাত শেষ হতে হতে বেঁচে থাকার ইচ্ছাটাই মরে গেল!

এরকম নানাবিধ মরে যাওয়া ইচ্ছের অসুখ নিয়ে বেঁচে আছি। আবার অসুখ হলে ব্রহ্মপুত্রে যাব। হয়তো মাহফুজ ভাই থাকবেন না, শিপনও অন্য কোথাও। দোকানটা হয়তো নতুন করে বানানো হবে। ছাগলটা থাকবে না, শিশুটিও বড় হয়ে যাবে। শুধু নদীটা থাকবে। অথবা সে-ও থাকবে না, মানুষেরই মতো!

সময়ের সন্তানেরা
সময়ের সন্তানেরা-২
After-Article Banner 2
After-Article Banner 2 mob

মন্তব্য লিখুন

ধন্যবাদ। নাম ও মতামত লিখুন। পর্যালোচনার পর অল্প সময়ের মধ্যেই মন্তব্যটি প্রকাশিত হবে।

Fill out this field
Fill out this field

সম্পর্কিত